ঢাকার চিড়িয়াখানার গেট
ঢাকা চিড়িয়াখানার ঠিক উত্তর প্রান্তে স্টাফ কোয়ার্টার্স। দিনের বেলায় এটি জীবন হাসি এবং পরিচিত গন্ধের জগৎ। কিন্তু রাত ১২টার পর এই এলাকা ঢাকার অন্য সব কোণের চেয়ে ভিন্ন এটি নীরবতা গিলে ফেলা এক অদ্ভুত জোন। এখানকার বাতাস গভীর রাতে যেন জমাট বেঁধে যায়।
এই কাহিনি একজন প্রাক্তন স্টাফ আবু বকর সিদ্দিক-এর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা। দশ বছর তিনি এই কোয়ার্টার্সে ছিলেন। কিন্তু তার শেষ বছর ২০১৯ সালের তীব্র শীতে তার জীবনে এমন কিছু ঘটে যা আজও তাকে তীব্র আতঙ্কে ভোগায়। আবু বকর একজন বাস্তববাদী মানুষ ছিলেন কিন্তু সেই শীতে তার সব যুক্তি ভেঙে গিয়েছিল।
স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর দিকে পুরোনো মরিচা ধরা একটি বিশাল লোহার গেট। এর জং ধরা লোহা অন্ধকারে আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে।
আবু বকর জানান একসময় রাতের শিফটের কর্মীরা এটি ব্যবহার করত। কিন্তু ২০০৪ সালের পরে কোনো এক রহস্যময় কারণে গেটটা স্থায়ীভাবে ইস্পাতের শিকল আর ভারী তালা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কারণ নিয়ে গুজব ছিল বহু: কেউ বলত সাপ, কেউ নেকড়ে, কেউ আবার বলত একজন নিরাপত্তাকর্মী গেটের সামনে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল। তার চোখ খোলা ছিল যেন শেষ মুহূর্তে সে কিছু ভয়ংকর দেখেছিল।
আবু বকর এই ধরনের গল্প বিশ্বাস করতেন না। তার মতে, “গুজব মানুষের প্রিয় খেলনা।” তবে সেই শীতে তিনি প্রথম নিজের চোখে দেখলেন গুজব সব সময় নিছক গল্প হয় না।
সময়টি ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। রাত ঠিক ১২টা। হাওয়াটা খুব ঠান্ডা কনকনে।
আবু বকর ডিউটি শেষে কোয়ার্টারে ফিরছিলেন। রাস্তাটা ফাঁকা। লাইটপোস্টের হলুদ আলোয় সবকিছু ধূসর লাগছিল।
গেটটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি থমকে গেলেন।
কারণ ওই লোহার দরজার ঠিক ওপাশ থেকে স্পষ্ট একটি শব্দ ভেসে আসছিল।
ধীরে ভারী মানুষের মতো হাঁটার শব্দ। শব্দটা ছিল সুনির্দিষ্ট ও ছন্দোবদ্ধ।
থাপ… থাপ… থাপ…
আবু বকর প্রথমে ভাবলেন অন্য কোনো স্টাফ। কিন্তু গেটটা তো ১৫ বছর ধরে বন্ধ! চোখ দিয়ে দেখে তিনি চমকে উঠলেন ওপাশে কোনো আলো নেই কোনো নড়াচড়া নেই। তবুও শব্দটা এক অচেনা ছন্দে চলতেই থাকে যেন গেটের ভেতরে কেউ ধৈর্য ধরে হেঁটে আসছে।
তিনি কাঁপা কণ্ঠে চিৎকার করে বললেন: “কে আছো? জবাব দাও!”
ওপাশ থেকে উত্তর এল না। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো শব্দটা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।
একেবারে গভীর নিস্তব্ধতা। এই নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি ছিল না এটি ছিল এক চাপ যা ইঙ্গিত করছিল যে ওপাশে কেউ বুদ্ধি নিয়ে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ তার মনে হলো গেটের ঠিক ওপাশে দাঁড়িয়ে কেউ যেন তাকে গভীর মনোযোগে দেখছে।
তিনি দ্রুত হাঁটা দিলেন। তিনি আর পিছনে তাকানোর সাহস পেলেন না। সেই রাতে ওই ধাপধাপ শব্দ এবং তার পরের শীতল নীরবতা তার মনে এক স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করল।
তার ঠিক দু’রাত পরের ঘটনা। রাত ১২টা ৬ মিনিট।
আবু বকর দুশ্চিন্তায় ঘরে থাকতে পারলেন না। সিগারেট খেতে তিনি বাইরে এলেন। তার চোখ সতর্কভাবে সেই লোহার গেটের দিকে।
দূর থেকে হলুদ আলোর আবছায়ায় তিনি একটি কালো ছায়া দেখতে পেলেন একজন মানুষ একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গেটের ওপাশে। তার উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং সে অস্বাভাবিকভাবে সরু ও স্থির।
আবু বকরের বুক ঠান্ডা হয়ে গেল। তিনি জানতেন গেটটা শক্ত করে আটকানো জংধরা। সেখানে স্বাভাবিকভাবে কারও থাকার কথা নয়।
তখন হাওয়ার সাথে গেটটা হালকা কেঁপে উঠল একটা মৃদু শব্দ হলো কিন্তু ছায়াটা এক ইঞ্চিও নড়ল না। একদম পেরেকের মতো স্থির। এটি যেন কেবল একটি আকৃতি যা কেবল উপস্থিত থাকার জন্যই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
ভয়ে তিনি ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলেন। তিনি বাইরে তাকানোর সাহস পেলেন না।
ঘণ্টাখানেক পর নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে তিনি বাইরে তাকালেন।
ছায়া নেই। কিন্তু গেটের ঠিক নিচে যেখানে ফাঁকা জায়গা ছিল সেখানে একটি গাঢ় কালো জলের ছাপ। কাদার মতো নয় বরং শীতল ঘন তরলের একটি ভেজা দাগ। দাগটি ছিল লম্বাটে যেন কেউ ভেতরের দিকে পা টেনে সরিয়ে নিয়েছে। আবু বকর বুঝতে পারলেন, যা কিছু ছিল সেটা গেট খুলে ভেতরে যায়নি। সে হয়তো ভেতরেই ছিল এবং বাইরে আসতে চেয়েছিল।
ডিসেম্বরের শেষ দিন। রাত ১টা ২০ মিনিট।
কোয়ার্টারে হঠাৎ তীব্র হৈচৈ শুরু হলো। লাইটের আলোয় দেখা গেল ডিউটি অফিসার জামাল হোসেন-কে পাওয়া গেছে। তিনি খুন হননি কিন্তু এমন এক অবস্থায় যা দেখে সবাই স্তব্ধ।
তার চোখ পুরো খোলা। মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল তীব্র ভয় ও আতঙ্কে তার দম বন্ধ হয়ে গেছে। দুটি হাত এমনভাবে তোলা যেন তিনি বুক থেকে কিছু একটাকে ঠেলে সরাতে চেয়েছিলেন। তার গলার কাছে দুটি কালো আঁচড়ের ক্ষীণ দাগ ছিল।
মৃত্যুর কারণ: রিপোর্টে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট লেখা হলো। কিন্তু উপস্থিত সবাই বুঝতে পারল তিনি ভয়ে মারা গেছেন।
পুলিশ এসে দেখল জামাল হোসেনের শেষ পায়ের ছাপের দিকটা সেই লোহার গেটের দিকে। ছাপগুলো গেটের ঠিক দুই ফুট দূরে তীব্রভাবে থেমে গেছে।
যেন তিনি দৌড়ানোর শেষ মুহূর্তে গেটের সামনে গিয়ে কোনো অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে…
স্থির হয়ে গেছেন।
জানুয়ারি ৩ তারিখ। রাত ১২টা ৪৫।
আবু বকর ছুটি নেবেন ঠিক করেছেন। তিনি ঘুমাতে পারেন না সর্বদা গেটের স্বপ্নে দেখেন।
সে রাতে আবার সেই শব্দ এল। এবার আগের চেয়ে স্পষ্ট। একেবারে গেটের দিকে উঠে আসা ধীরে কিন্তু নিশ্চিত।
থাপ… থাপ… থাপ…
কিন্তু এবার শব্দটা হঠাৎ থামল না। বরং দরজার খাঁজে নখের ঘষাঘষির মতো বীভৎস শব্দ এল। ধাতব গেটে যেন কিছু একটা খুব ধীরে আঁচড় কাটছে।
ক্রীইইচ… ক্রীইইচ…
আবু বকর শেষ সাহস সঞ্চয় করে একবার তাকালেন। তার চোখে যা পড়ল তা তার সব ভয়কে এক মুহূর্তে বাস্তবে পরিণত করল।
গেটের নিচের ফাঁক দিয়ে একটি হাত বেরিয়ে আছে।
কালো, শুকনো পাতলা হাত। হাতটি স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা ও কঙ্কালসার। হাতের আঙুলগুলো মাটি স্পর্শ করছে ধীরে ধীরে নড়ছে। নখগুলো দীর্ঘ ও হলদেটে।
যেন কেউ মাটিকে টেনে সরিয়েসেই গেটের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
আবু বকর আর এক মুহূর্তও দাঁড়াননি। তিনি চিৎকার না করে দৌড়ে পালাল। পরে কী ঘটেছে তা তিনি কাউকে বলেননি কিন্তু আমার সামনে বসে তিনি শুধু একটা বাক্য বলেছিলেন:
“ওটা মানুষ ছিল না। আর ওটা বাইরে আসতে চাইছিল। গেটটা আল্লাহর রহমতে বন্ধ ছিল না হলে হয়তো আজ তুমি আমার সাক্ষাৎকার নিতেই পারতে না।”
২০২৪-এ আমি গেটটা দেখেছি। একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে মরিচা ধরা জং পড়া। কাছে গেলে একটা অদ্ভুত ঠান্ডা অনুভূতি হয়। লাইটপোস্টের আলো গেটের ঠিক সামনে পড়লেও তার ওপাশটা সবসময়ই গাঢ় অন্ধকার থাকে।
একজন বর্তমান স্টাফ আমাকে নিচু স্বরে বললেন:
“ভাই, ওদিকে রাতে যাই না। পদশব্দ আসে। কখনও কখনও মনে হয় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দেখলে কিছুই দেখা যায় না। ওটা শুধু মধ্যরাতে আসে।”
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,“তাহলে গেটটা খোলে না কেন?”
তিনি শীতল হাসি হেসে ফিসফিস করে যোগ করলেন, “আগে যারা খুলতে গিয়েছিল, একজনও এখন এই কোয়ার্টার্সে নেই। গেটের ওপাশে যা আছে, তা ওপাশেই থাকাই ভালো।”
এটা কি সত্যি? নাকি কেবল স্থানিক গুজব? আমি জানি না।
কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত ঢাকা চিড়িয়াখানার স্টাফ কোয়ার্টারের লোকজন গভীর রাতে ওই গেটের সামনে দিয়ে হাঁটে না।
কিছু দরজা আছে যা বন্ধ থাকাই ভালো।
You must be logged in to post a comment.