এক পাপিষ্ট বান্দার সব গুনা মাফ করার গল্প
বসরা শহরের এক কোণে বাস করত এক ব্যক্তি, যার জীবন ছিল পাপের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া। সে ছিল চরম পাপিষ্ঠ—রাতদিন নেশায় মগ্ন, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। একদিন সে মারা গেল। তার মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি হলেন। কেউ এগিয়ে এল না তার স্বামীর জানাজায় সাহায্য করতে। প্রতিবেশীরা তার পাপের কারণে তার মৃত্যু-পরবর্তী কোনো কাজে অংশ নিতে রাজি হল না। তারা বলল, “এমন পাপীর জানাজায় আমরা কেন যোগ দেব?”
উপায়ান্তর না দেখে স্ত্রী কিছু লোককে টাকা দিয়ে ভাড়া করলেন। তারা তার স্বামীর লাশ জানাজা পড়ার স্থানে নিয়ে গেল। কিন্তু সেখানেও কেউ জানাজায় দাঁড়াল না। অবশেষে ভাড়া করা লোকেরা লাশ নিয়ে মরুভূমিতে চলে গেল দাফনের জন্য। মরুভূমির পাশেই ছিল একটি উঁচু পাহাড়, যেখানে বাস করতেন একজন মহান বুজুর্গ আলিম, যিনি ছিলেন আল্লাহর অতি নিকটবর্তী বান্দা।
হঠাৎ সেই বুজুর্গ পাহাড় থেকে নেমে এলেন এবং সেই পাপী ব্যক্তির জানাজা পড়তে শুরু করলেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ল পুরো শহরে। লোকেরা আশ্চর্য হয়ে বলাবলি করতে লাগল, “এত বড় পাপীর জানাজা পড়তে এই মহান বুজুর্গ কেন পাহাড় থেকে নেমে এসেছেন?” খবর শুনে দলে দলে মানুষ ছুটে এল এবং বুজুর্গের সাথে মিলে জানাজায় শরীক হল। কিন্তু তাদের আশ্চর্য কাটছিল না। তারা বুজুর্গকে প্রশ্ন করল, “হে আল্লাহর ওলি! এত পাপী লোকের জানাজা আপনি কেন পড়লেন?”
বুজুর্গ বললেন, “গত রাতে স্বপ্নে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—অমুক স্থানে যাও। সেখানে একটি লাশ পড়ে আছে, তার সাথে শুধু তার স্ত্রী ছাড়া কেউ নেই। তার জানাজা পড়ো, কারণ সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছে।”
এ কথা শুনে লোকজনের আশ্চর্য আরও বেড়ে গেল। বুজুর্গ তখন মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে ডেকে আনলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার স্বামীর চরিত্র কেমন ছিল? তার জীবনে কোনো ভালো কাজ ছিল কি?”
স্ত্রী বললেন, “হে আল্লাহর বান্দা! লোকমুখে যা শুনেছেন, ঠিক তাই। সে রাতদিন নেশায় ডুবে থাকত। তার কোনো ভালো কাজ আমার জানা নেই।”
বুজুর্গ বললেন, “ভেবে দেখো, কোনো ছোট্ট ভালো আমলও কি তার ছিল না?”
স্ত্রী চিন্তা করে বললেন, “আল্লাহর কসম, তার কোনো ভালো কাজ আমার মনে পড়ে না। তবে একটা অভ্যাস ছিল—প্রতিদিন ফজরের সময় তার নেশা কেটে যেত। সে কাপড় বদলে অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করত। নামাজ শেষ হলে আবার নেশায় ফিরে যেত। আর তার বাড়িতে প্রতিদিন এক-দুটি এতিম আসত। তাদের সে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসত এবং খাওয়াত। মাঝে মাঝে নেশা কেটে গেলে সে কাঁদতে কাঁদতে বলত, ‘হে প্রভু! জাহান্নামের কোন কোণটি এই পাপিষ্ঠ বান্দাকে দিয়ে ভর্তি করার ইচ্ছা করেছেন?’”
এ কথা শুনে সবাই বুঝল যে, আল্লাহ তাআলা তার এই কয়েকটি আমলের বরকতে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ফজরের নামাজের মহিমা, এতিমদের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের পাপের জন্য অনুতাপ—এগুলোই তার মুক্তির কারণ হয়েছে।
শিক্ষা:
আল্লাহর রহমত অসীম। একটি ছোট ভালো আমলও যদি খাঁটি হয়, তা পাপের পাহাড়কে ধ্বংস করে দিতে পারে। কখনো হতাশ হবেন না, আল্লাহর দরজায় ফিরে আসুন। ফজরের নামাজ কখনো ছাড়বেন না, এতিমদের স্নেহ করুন এবং পাপের জন্য কাঁদুন—এগুলো জান্নাতের চাবি।
(সূত্র: জীবনের ওপারে, পৃষ্ঠা ১৫৩)
#পৃষ্ঠা_৪৯৫৬+
You must be logged in to post a comment.