কাঁটাতারের কান্না
আমি রায়হান। পেশায় একজন ফিচার রিপোর্টার কিন্তু আমি আর শুধু রিপোর্টার নই। আমি এক জীবন্ত বিভীষিকার সাক্ষী। আমি যা দেখেছি যা অনুভব করেছি তা আপনাদের শোনাতেই হবে। এটি রক্ত হিম করে দেওয়া মতো, যা ভারতের সীমান্তের এক নির্দিষ্ট অংশে লুকিয়ে আছে। সেই জায়গা যেখানে একদিন আমাদের বোন, আমাদের কন্যা ফেলানীর নিথর দেহ ঝুলেছিল। সেই কাঁটাতারের ওপারে যেখানে মৃত্যু নীরবতার চেয়েও বেশি কথা বলে।
বহুদিন ধরে শুনছি, “ওইখানে গেলে রাতে কান্নার শব্দ শোনা যায়।” প্রথমবার যখন এই কথা শুনি, আমি কেবল একে এলাকার মানুষের লোককথা বা সীমান্তঘেঁষা মানুষের মানসিক চাপ ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু যতোবার লোকেরা একইরকম কথা বলল, তাদের চোখের ভয় ও বিশ্বাস যখন আমার সাংবাদিক মনকে আঘাত করল, ততোবার এক তীব্র কৌতূহল আমাকে টেনে নিল।
আমি জানি সত্য কখনও নিজে থেকে রিপোর্ট হয়ে যায় না তাকে টেনে বের করতে হয়। আমাকে যেতে হবে সত্যের খোঁজে, সেই অন্ধকারের উৎস সন্ধানে।
৭ জানুয়ারি সেই রাত। ঘটনার ঠিক বারো বছর পর। তারিখটা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটা ভার নিয়ে আমার সামনে এসেছিল।
আমি একা। বাইকের হেডলাইটের ক্ষীণ আলোয় পথ চিনেছি। পথটা যেন আধুনিক সময়ের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলেছে। সীমান্তের কাছে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রং যেন পাল্টে যাচ্ছে। বাতাস ভারী অস্বাভাবিক রকমের স্থির অদৃশ্য কোনো ভার বহন করছে যেন কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে সেই হাওয়ায়। আমার বাইকের ইঞ্জিন হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল যেন প্রকৃতি আমাকে আরও এগিয়ে যেতে বারণ করছে। এইবার হেঁটে চলো।
আমি বাইক লক করে দিলাম। মনে হচ্ছিল গাছের পাতাগুলোও আমাকে দেখে ফিসফিস করে কিছু বলছে কিন্তু তাদের ভাষা আমি বুঝতে পারছি না। আমার লোম খাঁড়া হয়ে উঠছে এ যেন শুধু নির্জনতা নয় এ যেন কোনো প্রস্তর যুগের অভিশাপের নীরবতা। অপেক্ষার নীরবতা।
আমার হাতে শুধু একটি পুরনো ক্যামেরা যা ফ্ল্যাশ ছাড়া কাজ করে না, একটি জীর্ণ রেকর্ডার যার ব্যাটারি কখন ফুরিয়ে যাবে তার ঠিক নেই, আর বুকভরা আতঙ্ক। ফোনে সিগন্যাল নেই, আমি আধুনিক পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রাচীণ কোনো বিভীষিকার দিকে হেঁটে যাচ্ছি। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে মাটির নিচে চাপা পড়া কোনো গোপন যন্ত্রণা যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে।
রাত প্রায় ১টা পেরিয়ে গেছে। সীমানার অস্থায়ী গেট পেরিয়ে আমি কাঁটাতারের কাছে পৌঁছালাম। দূর থেকে কাঁটাতার দেখেই শরীর কাঁপছে। এ শুধু লোহা নয় এ যেন মৃত্যু আর বিচ্ছেদের প্রতীক। মরিচা ধরা, ধুলোয় ঢাকা, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে যেন ইতিহাসের বিষাদ নিজেই বেঁচে আছে। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় কাঁটাতারের সারিগুলো রূপ নিয়েছে অসংখ্য ধারালো ছুরির যা আকাশকে চিরে দিচ্ছে।
চারপাশে অস্বাভাবিক নীরবতা। ঝিঁ-ঝিঁ পোকা নেই, শেয়াল নেই এমনকী সামান্য একটি পোকারও ডাক নেই। প্রকৃতি যেন শ্বাস চেপে ধরে রেখেছে। শুধু আমার বুটের শব্দ সেই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে। পায়ের শব্দ যেন আমার হৃদস্পন্দনের চেয়েও জোরে শোনাচ্ছিল।
হঠাৎ! ঠিক সামনের কাঁটাতারের নিচ থেকে শব্দ এল -ঝন ঝন! লোহার সাথে লোহার, নাকি লোহার সাথে মাংসের সংঘর্ষ? একবার নয়, থেমে থেমে। যেন কেউ ইচ্ছা করে কাঁটাতারে আঘাত করছে, এক অদ্ভুত যন্ত্রণাময় ছন্দ তৈরি করছে। বাতাস নেই ঝড় নেই, কোনো প্রাণী নেই।
আমার হৃৎপিণ্ড দ্রুত তালে ধুকপুক করতে শুরু করল যেন এক্ষুনি বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। কাঁপা হাতে রেকর্ডার অন করি। স্বরটাকে যতটা সম্ভব শান্ত রেখে বলি, “এ…এখানে কেউ আছেন? উত্তর দিন! আমি একজন সাংবাদিক, আপনাদের কথা শুনতে এসেছি।” আমার কণ্ঠস্বর আমার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্যরকম ক্ষীণ শোনাল।
ঠিক তখনই! বাতাস ফুঁড়ে এল সেই কণ্ঠস্বর। মৃদু কিন্তু এত যন্ত্রণাপূর্ণ যে মনে হলো কান ছিঁড়ে যাবে। সে যেন আমার কানের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে, কিন্তু আওয়াজ আসছে কাঁটাতারের ওপাশ থেকে।
“…আ…আমার শ্বাস… বন্ধ হয়ে আসছে… বাঁচাও… আমাকে নামিয়ে দাও… প্লিজ, মাফ করে দাও…”
আমার বুক চেপে ধরল কেউ। দম নিতে পারছি না, যেন অদৃশ্য কোনো হাতে আমার কণ্ঠনালী টিপে ধরেছে। আতঙ্ক আমার প্রতিটি শিরায় বিষ ঢেলে দিচ্ছে। আমি টর্চ জ্বালাই, কাঁপা হাতে আলো কাঁটাতারের দিকে ফেলি।
চোখের সামনে! কাঁটাতারের ওপরে হালকা নড়ছে একটি ছায়া। কোনো স্পষ্ট অবয়ব নয় শুধু কিশোরী মেয়ের আবছা আকৃতি বৃষ্টিতে ভেজা চুল, ছেঁড়া সালোয়ার-কামিজ। চোখে অসীম আতঙ্ক, যা যেন যুগ যুগ ধরে জমাট বেঁধে আছে।
সে ঝুলে নেই। শূন্যে দুলছে বাতাসের তোয়াক্কা না করে। মধ্যাকর্ষণ শক্তি যেন তার ওপর কাজ করছে না। আমি দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করি, “কে… তুমি কে? কেন কাঁদছো?” এই প্রশ্নে আমার নিজেরই কোনো বিশ্বাস ছিল না।
মেয়েটির ছায়া ধীরে ধীরে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। মুখে কোনো বৈশিষ্ট্য নেই শুধু দুটি ফাঁকা, অসহায় চোখ। সেই চোখে মনে হলো শুধু স্বপ্ন নয় গোটা জীবনটাই হারিয়ে গেছে। সেই ফাঁকা দৃষ্টি যেন আমাকে ভেদ করে আমার আত্মার গভীরে আঘাত করল।
ঠিক তখন সেই ফাঁকা চোখের দিকে তাকাতেই, ভয়ংকর এক আওয়াজ শোনা গেল। শুধু ফেলানীর কান্না নয় কাঁটাতারের দু’পাশে শত শত মানুষের কণ্ঠস্বর একসঙ্গে ফেটে পড়ল। তারা যেন আমাকে নয়, ইতিহাসের দিকে চিৎকার করছে।
“…আমাদের ঘরে ফেরা হলো না… কেউ শুনল না আমাদের আর্তি…”
“…আমার বিচার হয়নি! আমার মা এখনও অপেক্ষা করছে…”
“…সীমান্ত কি শুধু রক্ত আর লোহার নাম? কেন আমাকে মরতে হলো?”
“…আমরা একা নই! আমরা সবাই এখানে… এই কাঁটার অপেক্ষায়!”
আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল। বাতাস যেন বরফ হয়ে গেছে, আমার ফুসফুসে জমাট বেঁধেছে। আমি জ্ঞান হারানোর শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে। আমি কেবলই শুনতে চাইছি। দ্রুত রেকর্ডার ধরে কণ্ঠগুলো রেকর্ড করলাম, প্রমাণ রাখতেই হবে।
তারপর সেই ছায়া একটি কিশোরী আকৃতি ফিসফিস করে বলল, “ফেলানী।”
শব্দটি শুনতেই হঠাৎ সব থেমে গেল। সব নিস্তব্ধ। কাঁটাতারের ওপরে ছায়া স্থির হয়ে গেল। আমার টর্চের আলো ছায়ার মুখটাকে সামান্য হলেও স্পষ্ট করে তুলল হ্যাঁ, সেই পরিচিত মুখ যা গোটা দুনিয়াকে স্তম্ভিত করেছিল। সেই নিষ্পাপ মুখের নিথর অভিব্যক্তি।
আমি লক্ষ্য করি ছায়ার পায়ের নিচে, কাঁটাতারের গোড়ায় ধীরে ধীরে লাল রং ছড়িয়ে পড়ছে। রক্ত নয় এ যেন জমাট বাঁধা ইতিহাসের রং। সময় স্থির হয়ে গেছে এবং সেই ভয়ংকর ট্র্যাজেডি পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, “আমি একা নই… সীমান্তে যারা ন্যায়ের জন্য অপেক্ষা করছে, তারা সবাই এখানে। তাদের কান্নাই তুমি শুনলে। এখানে কান্না থামে না। কোনো বিচারও শেষ হয়নি। এই কাঁটাতার আমাদের আটকে রেখেছে, শুধু দেহ নয়, আমাদের আত্মাকেও।”
হঠাৎ! ঝড়ের মতো বাতাস ছুটে এল, যদিও আশেপাশের গাছের পাতা নড়ছে না। কাঁটাতার কেঁপে উঠল যেন এক্ষুনি ছিঁড়ে যাবে। টর্চের আলো নিভে গেল। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, শ্বাস নিতেও ভুলে গেলাম। কিছুক্ষণের পর আবার আলো জ্বালালাম ছায়াটি উধাও।
কাঁটাতার স্থির। চারপাশে হাড়কাঁপানো নীরবতা। এবারকার নীরবতা আরও ভয়াবহ, যেন ভয়াল কোনো দৈত্য ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি ভোরে শহরে ফিরে এলাম। ক্লান্ত বিধ্বস্ত, কিন্তু নতুন সত্য নিয়ে। আমি আর আগের রায়হান নই। সেই রেকর্ড… কাউকে দেখাতে পারিনি। অনলাইনে আপলোড করতে গেলে ফোন নিজেই ফাইল মুছে দিয়েছে যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি চায় না যে এই সত্য প্রকাশিত হোক।
আমি রায়হান বলছি ফেলানীকে ঝুলানো কাঁটাতারের পাশে কান্না আজও শোনা যায়। শুধু যারা হৃদয়ে সত্যের ভার বহনের সাহস রাখে, তারাই শুনতে পাবে। রাতে বাতাস থমকে যায়, কাঁটাগুলো নড়ে ওঠে, আর দূর থেকে ভেসে আসে একটি অব্যক্ত আর্তনাদ“…বাড়ি ফিরতে চাই…”
আমি ফিরে এসেছি। কিন্তু তারা এখনও সেখানে আছে। যত দিন এই কাঁটাতার দাঁড়িয়ে থাকবে,
যত দিন না এই নির্দোষ মৃত্যুর বিচার হবে, তত দিন ফেলানী ও অসংখ্য নির্দোষের এই ভয়ঙ্কর, নিঃশেষ আর্তনাদ চলতেই থাকবে।
You must be logged in to post a comment.