3I/ATLAS কমেট নিয়ে কিছু কথা
ফিজিক্সের একটা বেসিক নিয়ম হলো—সূর্যের তাপে বাষ্প হওয়া যেকোনো কিছুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক, এটাই আইন।
কিন্তু আমাদের সোলার সিস্টেমের তৃতীয় ইন্টারস্টেলার ভিজিটর, 3I/ATLAS, এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।
নাসা (NASA) এবং ইএসএ (ESA)-র লেটেস্ট ইমেজ প্রসেসিং বলছে, এই কমেটটির একটি নয়, দুটি লেজ আছে—এবং এর মধ্যে একটি লেজ সূর্যের দিকে মুখ করে আছে, যাকে বলা হচ্ছে “অ্যান্টি-টেইল” (Anti-Tail)।
এবং সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য?
ডিসেম্বরের ১৯ তারিখে এটি যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসবে, তখনও এই “অসম্ভব লেজটি” তার সাথেই থাকছে।
সাধারণত কমেটের অ্যান্টি-টেইল হলো একটি অপটিক্যাল ইলিউশন বা চোখের ধোঁকা, যা পৃথিবীর বিশেষ অবস্থানের কারণে তৈরি হয়। কিন্তু 3I/ATLAS-এর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে দেখেছেন, এটি শুধু ইলিউশন হতে পারে না।
পেরিহিলিয়ন (সূর্যের সবচেয়ে কাছে যাওয়ার পয়েন্ট) পার হওয়ার পরেও কেন এই লেজটি উল্টো দিকেই রয়ে গেল?
হার্ভার্ডের প্রফেসর আভি লোয়েব (Avi Loeb) প্রশ্ন তুলেছেন—এটি কি আসলেই বরফ আর ধুলোর তৈরি কোনো লেজ, নাকি কোনো বিশাল মহাকাশযানের “এক্সহস্ট” (Exhaust) যা ব্রেক কষার জন্য উল্টো দিকে ফায়ার করা হচ্ছে? আমরা কি একটি মৃত পাথর দেখছি, নাকি এমন কিছু যা নিজের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছে?
আসুন আবেগকে সরিয়ে ডাটাগুলো বিশ্লেষণ করি:
* দ্য ফ্লিপ (The Flip): সাধারণ কমেটের অ্যান্টি-টেইল সময়ের সাথে সাথে দিক বদলায় বা মিলিয়ে যায়। কিন্তু হাবল টেলিস্কোপের ছবিতে দেখা গেছে, 3I/ATLAS-এর অ্যান্টি-টেইলটি তার দিক এমনভাবে “ফ্লিপ” করেছে যা সোলার রেডিয়েশন প্রেশারের সাধারণ মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
* হার্টবিট (The Heartbeat): এই কমেটটি প্রতি ১৬.১৬ ঘণ্টায় একবার জ্বলে উঠছে এবং নিভছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন “হার্টবিট”। এটি কি শুধু তার ঘোরার (Rotation) কারণে হচ্ছে? নাকি এর সারফেসের কোনো বিশেষ অংশ নির্দিষ্ট সময় পর পর গ্যাস (বা সিগন্যাল) ছাড়ছে?
* ক্যামিক্যাল ককটেল: স্পেকট্রোস্কোপি ডাটা বলছে, এতে প্রচুর পরিমাণে মিথানল (Methanol) এবং হাইড্রোজেন সায়ানাইড আছে। আমাদের সোলার সিস্টেমের কমেটে এত বেশি মিথানল সচরাচর দেখা যায় না। এটি প্রমাণ করে এটি অন্য কোনো নক্ষত্র থেকে এসেছে, যেখানে কার্বন কেমিস্ট্রি আমাদের চেয়ে আলাদা।
তাহলে এই অ্যান্টি-টেইল আসলে কী?
সবচেয়ে যৌক্তিক সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা হলো—”Heavy Dust Theory”। সাধারণ কমেটের লেজে থাকে হালকা গ্যাস, যা সূর্যের বাতাস সহজেই দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু 3I/ATLAS সম্ভবত প্রচুর পরিমাণে ভারী ধাতব কণা বা বড় পাথরের টুকরো (Pebbles) রিলিজ করছে। এই ভারী কণাগুলোকে সূর্যের রেডিয়েশন সহজে ঠেলতে পারছে না, তাই এগুলো কমেটের চলার পথের পেছনেই (সূর্যের দিকে) থেকে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, এটি এলিয়েন স্পেসশিপ না হলেও, এটি সাধারণ কোনো “বরফের গোলা” নয়। এটি সম্ভবত একটি ধাতব সমৃদ্ধ (Metal-Rich) বস্তু, যা কোনো এক সময় কোনো গ্রহের কোর বা কেন্দ্র ছিল। কোনো এক মহাজাগতিক দুর্ঘটনায় সেটি ছিটকে আমাদের দিকে এসেছে।
১৯ ডিসেম্বর এটি আমাদের থেকে মাত্র ১৭০ মিলিয়ন মাইল দূর দিয়ে যাবে। আমি জানি, আপনারা অনেকেই টেলিস্কোপ নিয়ে ছাদে ওঠার প্ল্যান করছেন।
সত্যি বলতে, আমারও খুব ইচ্ছে করছে একবার নিজের চোখে এটাকে দেখতে। ভাবুন তো, কোটি কোটি বছর ধরে এই পাথরটা একা মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর গায়ে লেগে আছে অন্য কোনো নক্ষত্রের ধুলো।
আজ রাতে যখন আপনি এটার দিকে তাকাবেন, মনে রাখবেন—আপনি এমন কিছু দেখছেন যা মানব ইতিহাসের আগে তৈরি হয়েছে এবং যা আমাদের মৃত্যুর অনেক পরেও টিকে থাকবে। মহাকাশের এই নিঃসঙ্গতা বা “Loneliness” মাঝে মাঝে খুব রোমান্টিক মনে হয়, তাই না?
3I/ATLAS চলে যাচ্ছে, আর হয়তো কখনো ফিরবে না। কিন্তু যাওয়ার আগে এটি আমাদের জন্য একটি শেষ ধাঁধা রেখে যাচ্ছে। জাপানিজ বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, কমেটটি থেকে অদ্ভুত এক্স-রে (X-Ray) নির্গত হচ্ছে। সাধারণত কমেট এক্স-রে দেয়, কিন্তু 3I/ATLAS-এর এক্স-রে প্যাটার্নটি বড্ড বেশি… গোছানো (Organized)।
এটি কি শুধুই সোলার উইন্ডের সাথে ইন্টারেকশন?
নাকি প্রফেসর লোয়েব ঠিকই বলেছিলেন?
এই এক্স-রে কি কোনো বার্তা?
You must be logged in to post a comment.