এমন ৫টি কসমিক অঞ্চল, যেখানে মানুষ গেলে আর ফিরে আসা অসম্ভব 
মহাবিশ্ব এক অদৃশ্য নক্সায় তৈরি, যেখানে প্রতিটি পথের একেকটি পরিণতি, আর প্রতিটি সীমানার একেকটি শাস্ত্র আছে। আপাতদৃষ্টিতে শূন্য মনে হলেও মহাকাশের গভীরে লুকানো এমন কিছু অঞ্চল আছে যেগুলো প্রকৃতির ঘোষিত মহাজাগতিক কার্ফিউ, যেখানে প্রবেশ মানেই একমুখী টিকিট, ফিরে আসার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। মানব সভ্যতা যত উন্নতই হোক, পদার্থবিজ্ঞানের কঠোর বিধিনিষেধের সামনে আমাদের প্রযুক্তি আজও শিশু। তাই আজ আমরা যাত্রা করবো সেই পাঁচটি অঞ্চলের দিকে, যেখানে প্রবেশ করলে মানুষ নয়, রোবটও চিরতরে নিঃশব্দে মিলিয়ে যায়।
প্রথম অঞ্চল:
ইভেন্ট হরাইজন। কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে যে অদৃশ্য গন্ডি টেনে রাখা থাকে, সেটাই এই মৃত্যুচৌহদ্দি। ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরে সময় নিজেই বিকৃত হয়ে যায়, আলো পর্যন্ত বের হতে পারে না, মানুষের শরীর বা মহাকাশযান তো দূরের কথা। সেখানে প্রবেশ করা মানে পদার্থবিজ্ঞানের বই বন্ধ করে এক নতুন, অজানা সূত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করা। মহাবিশ্বের সবচেয়ে নীরব মৃত্যু ঘটে এই সীমারেখার ওপারে যেখানে ফিরে আসা শুধু অসম্ভব নয়, কল্পনাতেও অনুপস্থিত।
দ্বিতীয় অঞ্চল:
নিউট্রন তারার কিলিং জোন। একটি নিউট্রন তারা আকারে ছোট হলেও তার দানবীয় মহাকর্ষ আমাদের সমস্ত যুক্তি ভেঙে দেয়। মাত্র কয়েক শ কিলোমিটার দূরে গেলেই মানুষের শরীর পরমাণু পর্যায়ে ছিঁড়ে যাবে। আর যদি সেটা হয় ম্যাগনেটার? তাহলে তার চৌম্বক ক্ষেত্র এত শক্তিশালী যে ১০০০ কিলোমিটার দূরে থাকা মহাকাশযানও ধাতব পরমাণুর স্তরে ভেঙে যেতে পারে। এই অঞ্চলে গেলে জীবনের কোনো সম্ভাবনাই টিকে থাকে না শুধু শক্তির নিঃশব্দ উন্মাদনা।
তৃতীয় অঞ্চল:
গামা রে ডেথ কন। কোনো তারার মৃত্যুপূর্ব শেষ চিৎকার হলো গামা রে বিস্ফোরণ, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে পুরো গ্রহের বায়ুমণ্ডল ছিঁড়ে ফেলতে পারে। এই অজানা শঙ্কুর ভেতরে প্রবেশ করা মানে আলোর চেয়েও শক্তিশালী এক জীবন্ত তরঙ্গের মুখোমুখি হওয়া। পৃথিবী যদি কখনো এমন কোনো শঙ্কুর ভেতর পড়ে, সেদিন মানবসভ্যতা আকাশের দিকে তাকানোর আগেই ইতিহাস হয়ে যাবে। এই অঞ্চল হলো প্রকৃতির এক নিষেধাজ্ঞা অঞ্চল, যেখানে মানুষ তো নয়, কোনো রোবটও টিকে থাকতে পারে না।
চতুর্থ অঞ্চল:
পালসারের ডেড স্পাইরাল। পালসার হলো ঘূর্ণায়মান সময়ে বেঁধে রাখা এক মহাজাগতিক বাতিঘর। এর প্রতিটি রশ্মি ঘুরে এসে আশেপাশের যেকোনো বস্তুকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেয়। এর চারপাশের স্পাইরাল ট্র্যাকে মহাকর্ষ এত অস্থির যে কোনো যান যদি সেখানে প্রবেশ করে, সেটি অনবরত ঘূর্ণায়নের চাপে ধীরে ধীরে ধাতব ধূলিকণায় পরিণত হবে। পালসারের কাছে যাওয়া মানে সময়ের বুকে নিজের অস্তিত্বকে ছাইচিহ্নে রেখে আসা।
পঞ্চম অঞ্চল:
ওফিয়ুচাস সুপারনোভার অ্যাক্টিভ শেল। মহাবিশ্বে যখন কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়, তখন যে আঘাত তরঙ্গ বাইরে ছুটে যায়, সেটাকে বলে শক শেল। এটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মহাশূন্য জুড়ে তীব্র বিকিরণ ছড়াতে থাকে। এই শেলের মধ্যে প্রবেশ করা মানে ইলেকট্রন-প্রোটনের সম্পর্ক ভেঙে ফেলা মানুষ, ধাতু বা যন্ত্র কিছুই এখানে অবশিষ্ট থাকে না। সুপারনোভার এই অগ্নিবলয় হলো প্রকৃতির এক ভয়াল নিষিদ্ধ অঞ্চল, যেখানে শক্তি ছাড়া আর কিছুই বেঁচে থাকে না।
এই পাঁচটি কসমিক অঞ্চল আমাদের বলে দেয় যে- মহাবিশ্ব যত সুন্দর, ততই তার নিজস্ব কঠোর আইন আছে। আমরা মানবজাতি এগোচ্ছি, আরও দূর ছুটতে চাই, কিন্তু মহাবিশ্বের গোপন কার্ফিউগুলো যেন আমাদের সাহস আর সীমাবদ্ধতার মধ্যে সূক্ষ্ম এক রেখা টেনে দেয়। হয়তো একদিন আমাদের প্রযুক্তি এ বাধাগুলো অতিক্রম করবে কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, তারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়: মহাবিশ্ব অসীম হলেও, প্রতিটি সীমানার ভেতর লুকিয়ে আছে অদৃশ্য সতর্কবার্তা: “এখানে প্রবেশ নিষেধ, ফিরতি পথ নেই।”
Seek the light of knowledge
BIGGAN tottho | বিজ্ঞান তথ্য
You must be logged in to post a comment.