ধোঁয়ার গন্ধ
উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন কলেজের ঠিক পাশে একটি ছোট টিনের চালার বাড়িতে থাকেন আফজাল হোসেন। সত্তরের কাছাকাছি বয়স হলেও শরীরের চেয়ে তার মনই বেশি দুর্বল বিশেষত গত মাসখানেক ধরে।
তার রাতগুলো কাটছে এক দুর্বিষহ পুনরাবৃত্ত দুঃস্বপ্নে। প্রতি রাতে ঘড়ির কাঁটা ৩টা ছুঁলেই সেই স্বপ্ন ফিরে আসে: মাথার ওপর দিয়ে তীব্র শব্দে একটি বিশাল কালো ছায়া উড়ে আসছে, যেন আকাশ চিড়ে নেমে আসছে। ছায়াটির লক্ষ্য স্পষ্ট তাদের প্রতিবেশী “মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের” দোতলা ভবন।
আর ছায়াটা যখন ভবনের ছাদে আছড়ে পড়ছে তখন এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। আগুনের লেলিহান শিখা তীব্র ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং শত শত মানুষের বিশেষত শিশুদের আর্তনাদ। এই স্বপ্ন কেবল দৃশ্য নয় আফজাল স্বপ্নে পোড়া মাংস আর দাহ্য বস্তুর এক বীভৎস গন্ধও পেতেন। ১৫ই জুলাই রাতে তিনি হন্তদন্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠেছিলেন কপালে শীতল ঘাম বুকে অস্থিরতা। স্বপ্নে তার ছোট নাতনি আনিকা যে ওই কলেজেই পড়ে তাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছিল, “দাদু, পালিয়ে যাও! আগুন! সব পুড়ে যাচ্ছে!” তিনি চিৎকার করে তাকে সাবধান করতে চেয়েও পারলেন না তার গলা থেকে কোনো স্বর বের হলো না।
পরের কয়েকটা দিন স্বপ্নটি আরও স্পষ্ট হতে লাগল। ২১শে জুলাই যত ঘনিয়ে আসছিল স্বপ্নের সেই আগুন যেন তত উজ্জ্বল আর গন্ধটা তত তীব্র হচ্ছিল। তিনি তার স্ত্রীকে ঘটনাটি বলতেই তিনি রেগে গেলেন। “বুড়ো বয়সে তোমার মতিভ্রম হয়েছে, আফজাল! বিমান আবার কলেজ ভবনে আছড়ে পড়বে নাকি? অশুভ কথা বোলো না।”
কিন্তু আফজালের মন কোনো সান্ত্বনা মানতে পারছিল না। তিনি অনুভব করছিলেন এটা নিছক স্বপ্ন নয় এটা নিয়তির পূর্বাভাস এক অলৌকিক সংকেত। তিনি এক অশুভ শক্তির উপস্থিতি টের পাচ্ছিলেন যা তাকে এই আসন্ন বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্ক করতে চাইছে। ২০শে জুলাই রাতে স্বপ্নটা ভয়াবহতম রূপ নিল। এবার শুধু আগুন নয় তিনি স্পষ্ট শুনলেন অসংখ্য শিশুর করুণ কান্নার স্বর। আর অস্ফুটভাবে একটি নাম “তৌকির”।
স্বপ্নে দেখা কালো ছায়াটা যেন এবার আফজালের দিকেই তাকিয়ে হাসছিল তার অসহায়ত্বকে উপহাস করছিল। ভোরের আলো ফুটতেই তিনি তার ছেলে শামীম আর ছেলের বউকে ডেকে ব্যাপারটা বললেন, চোখে জল নিয়ে মিনতি করলেন। “২১ তারিখ! কাল দুপুর! তোমরা আনিকাকে কলেজে যেতে দিও না। ছুটি নাও। আমার কথা শোনো। আমার স্বপ্নে দেখা এই আগুন বাস্তব হলে সব শেষ হয়ে যাবে!”
শামীম যিনি পেশায় একজন সাধারণ চাকরিজীবী, তিনি বাবাকে আশ্বস্ত করলেন। “ঠিক আছে বাবা, কাল আমি জরুরি ছুটির কথা বলে আনিকাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হব তুমি শান্ত হও।”
তবে মনে মনে তিনি স্থির করলেন বাবার হয়তো বার্ধক্যজনিত কোনো সমস্যা হচ্ছে হয়তো তাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া উচিত। তবু বাবার মন রাখতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আনিকাকে অন্তত সেদিন ক্লাস শুরুর পর কলেজ থেকে নিয়ে আসবেন।
পরের দিন ২১ জুলাই, বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই আফজাল অস্বাভাবিক রকম অস্থির। বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। তার মনে হচ্ছিল যেন সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। শামীম কাজে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে স্ত্রীকে বললেন, “বাবাকে একটু সাবধানে রেখো। আমি ১২টা-১টার মধ্যে কলেজে যাব আনিকাকে নিয়ে আসতে।” দুপুর তখন ১টা। আফজাল বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, তার বুক ধড়ফড় করছে। হঠাৎ তিনি মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানের অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ এবং ভয়ানক শব্দ শুনতে পেলেন। শব্দটা কাছে আসছে… খুবই কাছে। আফজালের শরীর হিম হয়ে গেল। সেই কালো ছায়া! তিনি দুর্বল শরীরে যতটুকু শক্তি পেলেন চিৎকার করে উঠলেন, “এসে গেছে! পালাও! সবাই পালাও!” ঠিক তখনি, একটি ভয়ঙ্কর কান-ফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ। বিকট আঘাতে যেন পুরো দিয়াবাড়ি কেঁপে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আকাশের দিকে উঠল এক বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। কালো বীভৎস ধোঁয়া যেন মেঘের মতো পুরো আকাশ ছেয়ে ফেলল। আফজাল টলতে টলতে বারান্দায় দাঁড়ালেন। মাইলস্টোন কলেজের হায়দার আলী ভবনের দিকে তাকিয়ে তার চোখ স্থির হয়ে গেল। একটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়েছে দোতলা ভবনটির ছাদে। তার স্বপ্নের দৃশ্য হুবহু জীবন্ত কিন্তু বাস্তবতার ভয়াবহতা স্বপ্নে দেখা দৃশ্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়েছে। তিনি স্পষ্ট অনুভব করলেন ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে আছে সেই বীভৎস পোড়া গন্ধ যা তিনি বহু রাতে স্বপ্নে অনুভব করেছেন। এটি কেবল ধাতব কাঠামোর পোড়া গন্ধ নয় এটি ছিল মাংস এবং জীবনের গন্ধ।
তৎক্ষণাৎ আফজাল তার স্ত্রীকে বললেন, “আমার নাতনি! আনিকা! তাড়াতাড়ি!” তিনি তার বার্ধক্যের দুর্বলতা ভুলে স্কুলের দিকে দৌড়াতে শুরু করলেন। ঘটনাস্থলে তখন এক প্রলয়ংকরী বিশৃঙ্খলা। ধ্বংসস্তূপের স্তূপ জ্বলন্ত ভবনের কাঠ আর আহত মানুষের চিৎকার। ভিড়ের মধ্যে আফজাল তার ছেলেকে খুঁজছেন। হঠাৎ তিনি তার ছেলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন শামীম মাটিতে বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। তার পাশে তার স্ত্রী মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। “বাবা, আনিকা… ও তো আগেই ছুটি নিয়েছিল। কিন্তু… কিন্তু ওর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিয়া, যার ওই দিনের ক্লাসটা মিস হয়েছিল… রিয়া সেদিন ফোন করে আনিকাকে বলেছিল তার ব্যাগটা এনে দিতে। আনিকা ঠিক তখনই… ঠিক তখনই রিয়াকে ব্যাগটা এগিয়ে দিতে গিয়ে…” শামীমের কথা শেষ হলো না। তার কান্না সব বলে দিল। আনিকা হয়তো দুর্ঘটনা এড়াতে পারত কিন্তু বন্ধুর প্রতি দায়িত্ববোধ তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আফজাল যখন তার ছেলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন, তখন হঠাৎ তিনি চোখ ফেরালেন কলেজের মেইন গেটের দিকে। ভিড়ের মধ্যে দুটি ছায়ামূর্তি দেখলেন ছোট ছোট মেয়েদের মতো। তাদের মুখ আগুনে পোড়া চোখ দুটি নিদারুণ বিষাদে ভরা। তারা যেন ধ্বংসস্তূপের ওপর ভাসছে। তাদের একজনের কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে উঠল, “আমরা যেতে পারিনি, দাদু। তুমি জানো! তুমি বলেছ, ‘উড্ডয়ন ত্রুটি’… তুমি জানো! আমাদের যাওয়ার কথা ছিল না!” আফজাল বুঝলেন তার স্বপ্ন কেবল দুর্ঘটনা দেখতে আসেনি এটি ছিল এক করুণ নিয়তির ইঙ্গিত এক অলৌকিক বার্তা যা তাকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু তিনি বার্তাটি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারেননি। তিনি দেখলেন সেই ছায়ামূর্তি দুটি ধোঁয়ার কুণ্ডলীর সঙ্গে মিশে গেল আর তাদের মধ্যে একজন শেষবারের মতো ফিসফিস করল, “তৌকির… উড্ডয়ন ত্রুটি…” সেই নাম, যা তিনি স্বপ্নে শুনেছিলেন। পরে সংবাদপত্রে জানতে পারলেন নিহত পাইলটের নাম ছিল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম। তদন্ত কমিটি এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির পাশাপাশি পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটিও চিহ্নিত করেছে। আফজাল বুঝে গেলেন কিছু রহস্য মানুষের হাতের বাইরে। তার স্বপ্ন ছিল এক অভিশাপ যা তিনি এড়াতে পারেননি কেবল দেখতে পেয়েছিলেন। এবং এখন সেই কলেজের ধ্বংসস্তূপ যেখানে ২৬ জন কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থী এবং ১০ জন বয়স্ক ব্যক্তি, মোট ৩৬টি প্রাণ অকালে ঝরে গেছে প্রতি রাতে এক ভৌতিক নীরবতা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। আফজাল প্রতিদিন সেই বারান্দায় বসেন আর দূর আকাশে কোনো বিমানের শব্দ শুনলে তার কানে ভেসে আসে সেই শিশুদের কান্নার স্বর আর একুশে জুলাইয়ের আগুনের বীভৎস গন্ধ।
তুমি কি কখনও এমন স্বপ্ন দেখেছো, যা পরদিন সত্যি হয়ে গেছে?
কমেন্টে লিখে বলো স্বপ্ন, না কি সতর্কবার্তা?
You must be logged in to post a comment.