সবর ও আল্লাহর রহমত: হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর পরীক্ষা ও পুরস্কার
একদা আল্লাহর দরবারে ফেরেশতারা আলোচনা করছিলেন: “পৃথিবীর সেরা মানুষ কে?” এক ফেরেশতা বললেন, “হযরত আইয়ুব (আঃ)। কারণ তিনি অত্যন্ত ধৈর্যশীল, দানশীল এবং সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করেন।”
শয়তান এই কথা শুনে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করল: “হযরত আইয়ুব (আঃ) শুধু ধন-সম্পদ থাকার জন্যই ইবাদত করে। আপনি সব নিয়ে নিলে সে আর কৃতজ্ঞ থাকবে না।”
আল্লাহ শয়তানকে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিলেন।
১. সম্পদ ও সন্তানের ক্ষতি
শয়তান প্রথমে হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর বাগানে আগুন লাগিয়ে দিল। সব ফল ও শস্য নষ্ট হয়ে গেল। হযরত আইয়ুব (আঃ) সবর করে বললেন: “আল্লাহ যা দিয়েছেন, তিনি তা ফিরিয়ে নিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর)!” এরপর তাঁর গবাদি পশু ও সন্তানদের ওপর বিপদ এলো। একে একে তিনি সব হারালেন। কিন্তু তাঁর ঈমান বদলালো না। তিনি বললেন: “আমি আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট।”
২. আঠারো বছরের রোগ
এরপর শয়তান তাঁর শরীরে এক ভয়ংকর রোগ ধরিয়ে দিলো। তাঁর শরীর ক্ষত ও কৃমিতে ভরে গেল। এমন ভয়ানক অবস্থায় তিনি আঠারো বছর অসুস্থ রইলেন। সবাই তাঁকে ছেড়ে গেল। শুধু তাঁর স্ত্রী বিবি রহিমা (রাহামারামাহু) তাঁর সেবা করতে থাকলেন। একবার শয়তান হাকিম সেজে বিবি রহিমাকে ধোঁকা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু হযরত আইয়ুব (আঃ) তা বুঝে ফেললেন। মানুষও তাঁকে কষ্টদায়ক কথা বলতে শুরু করল। তখন তিনি আল্লাহর কাছে মিনতি করে দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ! মানুষের কথা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তুমি দয়ালু, আমার অবস্থা তুমি জানো।” আল্লাহর স্মরণ: কঠিনতম সময়েও তিনি আল্লাহর কাছে অভিযোগ না করে ধৈর্য ধরে প্রার্থনা করেন, যেমন কুরআন শরীফে উল্লেখ আছে: “যখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডেকে বলেছিলেন, ‘আমি তো দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু’।” (সূরা আম্বিয়া: ৮৩)।
৩. আল্লাহর দ্বিগুণ প্রতিদান
আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ) এসে বললেন: “পা দিয়ে মাটিতে চাপ দিন!” হযরত আইয়ুব (আঃ) তাঁর পা দিয়ে মাটিতে চাপ দিতেই সেখানে একটি পানির উৎস বের হলো। আল্লাহ্র আদেশে তিনি সেই পানিতে গোসল করলেন। গোসল করার সাথে সাথেই হযরত আইয়ুব (আঃ) সুস্থ, সুদর্শন ও শক্তিশালী হয়ে গেলেন! তাঁর স্ত্রী রাহামারামাহু বাইরে থেকে ফিরে এসে তাঁর সুদর্শন স্বামীকে চিনতে পারলেন না। তিনিও সেই অলৌকিক পানিতে গোসল করলে আগের চেয়ে আরও সুন্দর হয়ে গেলেন।
সুস্থতা ও প্রাচুর্য: আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করে তোলেন, তাঁর সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন এবং তাঁর জীবন থেকে সমস্ত দুঃখ দূর করে দেন।
তাঁরা ঘরে ফিরে দেখলেন, আল্লাহর কুদরতে তাঁদের আগের সব সম্পদ, বাগান, গবাদি পশু এবং সন্তান—সবই আল্লাহ তা’আলা দ্বিগুণ পরিমাণে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাঁর ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার কারণে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বলেন: “আমি তাঁর পরিবার ও তাঁর মতো আরও অনেকে তাঁর সাথে ফিরিয়ে দিলাম।” (সূরা সাদ: ৪৩)
শিক্ষা:
হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর জীবন প্রমাণ করে যে, সবর (ধৈর্য) হলো ঈমানের সবচেয়ে মূল্যবান গুণ। ধৈর্যশীল বান্দাকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর পরীক্ষার শেষে অবশ্যই দ্বিগুণ প্রতিদান দিয়ে সম্মানিত করেন।
You must be logged in to post a comment.