কেন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি একদিন ‘অদৃশ্য’ হয়ে যাবে?
আকাশের দিকে তাকালে আপনি যেটা দেখেন রুপালি ধুলোর মতো একটি আলোকমণ্ডল, সেটাই আমাদের ঘর, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। কিন্তু অবাক করা সত্য হলো এই গ্যালাক্সিটাই একদিন আর থাকবে না, অন্তত আমরা যেভাবে দেখি, সেভাবে থাকবে না। মিল্কিওয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে না, কিন্তু একসময় তার পরিচয়টাই বদলে যাবে। কেন? চলুন শুরু করি মহাজাগতিক এক রহস্যভ্রমণ।
প্রথম কারণ,
অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সির সঙ্গে সংঘর্ষ। প্রায় চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন বছর পরে, আমাদের দিকে ধেয়ে আসবে বিশাল অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সি। প্রতি সেকেন্ডে ১১০ কিলোমিটার বেগে দুইটি গ্যালাক্সি একে অপরের দিকে ছুটে আসছে। আর যখন এই দু’টি বিশাল গ্যালাক্সি মুখোমুখি হবে, মিল্কিওয়ের সুন্দর সর্পিল হাতগুলো ছিঁড়ে যাবে। তারা ছড়িয়ে পড়বে বিশাল ধুলো-মেঘে, নক্ষত্রগুলো ছিটকে যাবে নতুন কক্ষপথে। মিল্কিওয়ে আর থাকবে না, থাকবে এক নতুন গ্যালাক্সি ‘মিল্কড্রোমেডা’ বা ‘মিলকমিডা’, একটি বিশাল উপবৃত্তাকার সুপারগ্যালাক্সি।
দ্বিতীয় কারণ,
ডার্ক এনার্জির মহাজাগতিক বিস্তার। অদৃশ্য এক শক্তি, যা মহাবিশ্বকে ক্রমশ দ্রুত প্রসারিত করে চলেছে। প্রায় ১০০ বিলিয়ন বছর পরে, মহাবিশ্ব এত দ্রুত প্রসারিত হবে যে আমাদের নতুন গ্যালাক্সির বাইরে থাকা বাকি সব গ্যালাক্সি চোখের আড়ালে চলে যাবে। তাদের আলো আর কখনও আমাদের কাছে পৌঁছাবে না। ভবিষ্যৎ সভ্যতারা ভাববে মহাবিশ্বে হয়তো আমরা একাই আছি। গ্যালাক্সি যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, বাস্তবে নয় বরং আলো পৌঁছাতে পারবে না বলে।
তৃতীয় কারণ,
নক্ষত্রদের মৃত্যু। সময়ের সাথে সাথে নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে। লাল দৈত্য, সাদা বামন, নিউট্রন তারা একেকটা তারকা একদিন নিভে যাবে ঠাণ্ডা ছাই হয়ে। একসময় পুরো গ্যালাক্সি অন্ধকার, নিস্তব্ধ, মৃত হয়ে পড়বে। তখন মিল্কিওয়ে নামের কোনো উজ্জ্বল পরিচয় আর থাকবে না।
চতুর্থ কারণ,
গ্যালাক্সির ‘ইভাপোরেশন’ বা বাষ্পীভবন। এটি সবচেয়ে ধীর, কিন্তু অনিবার্য। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে নক্ষত্ররা একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে ধীরে ধীরে গ্যালাক্সি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। কোটি কোটি বছর পর মিল্কিওয়ে এমনভাবে ছড়িয়ে যাবে যে গ্যালাক্সি বলে কিছু চিনতেই পারা যাবে না।
তাই মিল্কিওয়ে একদিন অদৃশ্য হয়ে যাবে, তবে হঠাৎ নয়, বরং রূপ বদলাতে বদলাতে, ধীরে ধীরে। কখনো সংঘর্ষে, কখনো প্রসারণে, কখনো মৃত্যুর অন্ধকারে, আবার কখনো নীরব বাষ্পীভবনে।
মহাবিশ্বে কিছুই চিরস্থায়ী নয়, গ্যালাক্সিও না। আর আমরা? আমরা সেই মহাজাগতিক নাটকের ক্ষুদ্র দর্শক, যাদের জীবদ্দশা এতটাই ছোট যে এসব পরিবর্তন কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সত্য যত দূরেই হোক, একদিন মিল্কিওয়ে তার পরিচয় হারাবে। আর আমরা হারাবো সেই রুপালি আকাশঘেরা পথটাকে যাকে আজ আমরা বলি “মিল্কিওয়ে”।
কলমেঃ আল মামুন রিটন
You must be logged in to post a comment.