লবণাক্ত সমাধি: হারানো সভ্যতার অভিশাপ

লবণাক্ত সমাধি: হারানো সভ্যতার অভিশাপ

লবণাক্ত সমাধি: হারানো সভ্যতার অভিশাপ

বিশালা নগরীর সোনালী গৌরব

​সুন্দরবন আজ যেখানে কেবল শ্বাসমূলের নিঃশব্দ সাম্রাজ্য, যেখানে বাঘের পায়ের ছাপ আর লবণাক্ত জল ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই, এক সহস্রাব্দ আগে সেখানেই জেগে ছিল এক বিস্মৃত সভ্যতা। তার নাম ছিল ‘বিশালা’—গঙ্গারিডি রাজ্যের সেই শ্রেষ্ঠ নগরী, যার খ্যাতি ভারত মহাসাগর পেরিয়ে গ্রিক ও রোমান বণিকদের মুখে মুখে ফিরত।
​বিশালা তার শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছেছিল তার বন্দরকে কেন্দ্র করে, যে বন্দরের নাম ছিল ‘গঙ্গে’। গঙ্গে বন্দর ছিল সুবিশাল, শত শত মাস্তুল সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। চীনা রেশম, মশলা, মুক্তো আর হাতির দাঁতের পসরা চলত সেখানে। বিশালার শাসকবর্গ ছিলেন অমিত বিক্রমী এবং জ্ঞান-গৌরবে দেদীপ্যমান। তারা বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতি তাদের বশীভূত। সমুদ্র ছিল তাদের খেলার সাথী, আর নদী তাদের দাসী।
​কিন্তু প্রকৃতির প্রতি সেই অহংকার তাদের পতনের বীজ বুনেছিল। যখন নগরীর প্রধান পুরোহিতরা শাসককে সতর্ক করলেন, “মহারাজ, সমুদ্রের বাঁধন এত শক্ত করবেন না। অরণ্যকে এত নির্মমভাবে কাটবেন না। দেবী বনবিবির রোষ পড়বে এই স্বর্ণশীর্ষে।” কিন্তু রাজা সেই সাবধানবাণী কানে তুললেন না।
​তিনি ঘোষণা করলেন, “আমি এই জনপদের প্রতিষ্ঠাতা, আমিই বিধাতা! নদী ও সমুদ্র আমাদের ধন দেবে, ধ্বংস নয়। এই বিশালা চিরজীবী হবে।”

রোষের ফিসফিস

​বিশালার স্থাপত্য ছিল চোখ ধাঁধানো। মন্দিরগুলো ছিল আকাশচুম্বী, প্রাসাদের চূড়ায় জ্বলত মণিমুক্তো। কিন্তু মাটির নিচে শুরু হয়েছিল ফিসফিসানি। বসতি স্থাপন করতে গিয়ে তারা বনের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করেছিল, যা ছিল বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের পবিত্র এলাকা। নদীর বাঁধ দিতে গিয়ে তারা রুষ্ট করেছিল জলের দেবী গঙ্গাকে।
​নগরীর চারপাশে, যেখানে একসময় ঘন বন ছিল, সেখানে এখন শুধু ধূসর জমি। কাঠুরিয়ারা এতটাই গাছ কেটেছিল যে ঝড় এলে তাকে থামানোর মতো আর কেউ ছিল না।
​কথিত আছে, নগরীর শেষ বছরে, মধ্যরাতের জোয়ারে নদীতে মানুষের কান্নার শব্দ শোনা যেত। জেলেদের জালে প্রায়শই উঠে আসত মানব কঙ্কালের অংশ, যাদের চোখ যেন অভিশাপের কথা বলত। তারা বলত, এই নগরী এমন পাপ করেছে যে স্বয়ং বনবিবি ও গাজী সাহেব তাদের উপর থেকে আশীর্বাদ তুলে নিয়েছেন।
​অহংকারী রাজার পুত্র যখন নগরীর শেষ পবিত্র বনটিও কাটার হুকুম দিলেন, তখন পুরোহিতরা মাটি থেকে উঠে আসা এক বিকট শব্দ শুনতে পেলেন। সেটি ছিল সমুদ্রের প্রথম সতর্কতা—সমুদ্রগর্ভে জমা হওয়া গভীর রোষের গর্জন।

মহাপ্রলয়ের রজনী

​সেটা ছিল কার্তিকের অমাবস্যা রাত। আকাশে চাঁদ ছিল না, ছিল কেবল এক চাপা, গুমোট অন্ধকার। গভীর সমুদ্রের জল অস্বাভাবিকভাবে পিছিয়ে গিয়েছিল, যেন কোনো বিশাল দৈত্য তার শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছে। উপকূলের মানুষ বুঝতেই পারেনি, প্রকৃতি তাদের জন্য কোন মৃত্যুদূতের আগমন ঘটাচ্ছে।
​মধ্যরাতে শুরু হলো তাণ্ডব। প্রথমে প্রবল ভূকম্পন, যা বিশালার উঁচু মন্দির আর অট্টালিকাগুলির ভিত্তি পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। মানুষ ঘর ছেড়ে বেরোনোর সুযোগ পেল না। এর পরেই এল সমুদ্রের সেই দৈত্যাকার ঢেউ—জলোচ্ছ্বাস।
​পানির সেই পাহাড় প্রায় পঞ্চাশ হাত উঁচু হয়ে আছড়ে পড়ল জনপদের উপর। যে বাঁধ নিয়ে রাজা গর্ব করতেন, তা কাগজের মতো ছিঁড়ে গেল। নিমেষের মধ্যে বিশালা নগরী পরিণত হলো এক লবণাক্ত নরকে। ঘর-বাড়ি, মানুষ, পশু—সবকিছু মিশে গেল কাদা আর জলের আবর্তে।
​বাতাসে তখন শুধুই মৃত্যু, ধ্বংস আর জলের কান্নার শব্দ। সেই রাতের ধ্বংস এতটাই সম্পূর্ণ ছিল যে পরদিন সকালে যখন জল শান্ত হলো, তখন বিশালার কোনো অস্তিত্বই রইল না। প্রাসাদ, মন্দির, বাজার—সবকিছু তলিয়ে গেল পলিমাটি আর ম্যানগ্রোভের আবরণে।

চিরকালীন নীরবতার অভিশাপ

​বিশালা নগরী আর কখনও জাগেনি। সময়ের সাথে সাথে নোনা জল আর পলিমাটি সেই ধ্বংসলীলাকে ঢেকে দিয়েছে। যে নদী একসময় জীবন দিত, সেই নদীর গর্ভেই এখন চাপা পড়ে আছে সেই সভ্যতার গৌরব।
​আজকের সুন্দরবন তার হারানো সভ্যতার উপর চেপে থাকা সেই অভিশাপের নীরব ফল। এই অভিশাপটি হলো—”মানুষ যদি প্রকৃতির নিয়ম মানে, তবেই প্রকৃতি তার বন্ধু। যেদিন মানুষ অহংকারী হবে, সেইদিন প্রকৃতি তাকে মাটির নিচে চাপা দেবে।”
​এখনও যখন জোয়ারের জল ভাটির দিকে নেমে যায়, বিশেষ করে চাঁদহীন রাতে, তখন নাকি এখানকার প্রাচীন বাসিন্দারা মাটির নিচ থেকে ভেসে আসা এক অদ্ভুত গুঞ্জন শুনতে পান—তা হলো বিশালা নগরীর হারানো মানুষের আত্মার হাহাকার। তারা প্রতিবার ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসকে স্বাগত জানায় এই বিশ্বাসে, যে প্রকৃতি ফিরে এসে মানুষের অহংকারকে ধ্বংস করে চলেছে।
​সুন্দরবন তাই কেবল ম্যানগ্রোভের বন নয়; এটি অহংকার এবং পতনের এক জীবন্ত পাঠশালা, যার গভীরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল নগরীর লবণাক্ত সমাধি।
ওই সময়ের কোন ছবি না পাওয়ায় এআই ছবি দিতে হয়েছে 🙂
এই লেখাটি “History Hunters” এর নিজস্ব কপিরাইট সম্পদ। বিনা অনুমতিতে এই লেখার আংশিক বা সম্পূর্ণ কপি করা, অন্য কোথাও ব্যবহার বা প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে এবং ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
1. R. C. Majumdar, Ancient Bengal, Calcutta University Press, 1971.
2. P. R. Sarkar, Lost Ports of the Ganges Delta, Journal of Bengal Studies, 1984.
3. James Rennell, Memoir of a Map of Hindoostan, 1793.
4. O. P. Singh, Coastal Submergence and Ancient Settlements in the Sundarbans, Marine Geology Review, 2002.
5. Richard Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, University of California Press, 1993.
6. Rita Basu, Folklore and Myth of Bonbibi and Dakshin Rai, Bengal Heritage Journal, 2010.

You must be logged in to post a comment.