মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কিছু অজানা রোমাঞ্চকর তথ্য

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কিছু অজানা রোমাঞ্চকর তথ্য 🎇

রাতের আকাশে যখন আমরা তাকাই, চোখে পড়ে এক দুধসাদা আলোর প্রবাহ, যা একপ্রকার নরম আলোকবৃত্তের মতো আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। এই আলো যেন স্বপ্নের নদী, কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো নদী নয়—এটাই আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি, “মিল্কিওয়ে” বা “আকাশগঙ্গা।” এটি শুধু আমাদের সৌরজগতের বাসস্থানই নয়, বরং মহাবিশ্বের এক বিশাল নক্ষত্রনগরী, যেখানে কোটি কোটি সূর্যের মতো তারা, গ্রহ, ধূলিকণা ও অদৃশ্য শক্তি একসাথে নৃত্য করছে মহাকাশের অন্তহীন বিস্তারে। তবু এত পরিচিত নাম হওয়া সত্ত্বেও মিল্কিওয়ে সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা এখনও এক রহস্যময় অধ্যায়, যার প্রতিটি তথ্য আমাদের অবাক করে দেয়।
মিল্কিওয়ে কোনো সমতল চাকতির মতো নয়, বরং এটি এক বিশাল সর্পিলাকার গ্যালাক্সি, যার ব্যাস প্রায় ১ লাখ আলোকবর্ষ, আর এতে রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি তারা। আমাদের সূর্য সেই অসংখ্য তারারই একটি ক্ষুদ্র সদস্য। গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে রয়েছে এক ভয়ংকর অদৃশ্য দানব—“স্যাজিটারিয়াস এ*” নামে পরিচিত এক সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, যার ভর আমাদের সূর্যের প্রায় ৪ মিলিয়ন গুণ বেশি। এই ব্ল্যাক হোলটি যেন গ্যালাক্সির হৃদয়—এর চারপাশে নক্ষত্রগুলো ঘুরছে এক মহাজাগতিক সুরে, আর মাঝে মাঝে এটি নিঃশব্দে জেগে ওঠে ভয়াবহ শক্তির বিস্ফোরণে, যা পুরো গ্যালাক্সির শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
আকাশগঙ্গার বয়স আনুমানিক ১৩.৬ বিলিয়ন বছর—অর্থাৎ এটি মহাবিশ্বের প্রথম যুগ থেকেই অস্তিত্বশীল। কিন্তু মিল্কিওয়ের তারাগুলো একসাথে জন্ম নেয়নি। পুরোনো তারাগুলোর কিছু এতটাই প্রাচীন যে তারা গ্যালাক্সির গঠন শুরুর আগেই জন্মেছিল। অপরদিকে নতুন তারাদের জন্ম চলছে আজও, বিশেষ করে “অরিয়ন আর্ম” বা “অরিয়ন বাহু” নামে পরিচিত অঞ্চলে, যেখানে আমাদের সূর্যও অবস্থান করছে। এই অঞ্চলটি তুলনামূলকভাবে তরুণ, প্রাণবন্ত এবং নতুন তারার জন্মের জন্য বিখ্যাত।
সূর্য গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারপাশে একটি পূর্ণ প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করতে প্রায় ২৩ কোটি বছর সময় নেয়—অর্থাৎ পৃথিবী যত পুরনো, সূর্য এখন পর্যন্ত মাত্র বিশবার গ্যালাক্সির কেন্দ্র ঘুরে এসেছে। গ্যালাক্সির এই ঘূর্ণন এত বিশাল যে, যদি কেউ আলোর গতিতে ভ্রমণ করতে পারত, তবুও এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে তার লাগত এক লক্ষ বছর।
তবে মিল্কিওয়ে একা নয়। এটি এক বিশাল গ্যালাক্সি পরিবারে অন্তর্ভুক্ত, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন “লোকাল গ্রুপ”। এই গোষ্ঠীতে রয়েছে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি, ট্রায়াঙ্গুলাম গ্যালাক্সি এবং আরও প্রায় ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র গ্যালাক্সি। মিল্কিওয়ে ও অ্যান্ড্রোমিডা বর্তমানে একে অপরের দিকে ধেয়ে আসছে ঘণ্টায় প্রায় ২৫০,০০০ মাইল বেগে। ধারণা করা হয়, প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর পর এ দুই গ্যালাক্সি মুখোমুখি সংঘর্ষে মিলিত হবে। এই সংঘর্ষে গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাবে না, বরং মিশে তৈরি করবে এক নতুন গ্যালাক্সি—যার নাম দেওয়া হয়েছে “মিলকমিডা।” তখন আমাদের রাতের আকাশ হবে এক অনন্য সৌন্দর্যের দৃশ্য—দুটি গ্যালাক্সির আলোকনৃত্যে মহাজাগতিক ক্যানভাস জ্বলে উঠবে।
গ্যালাক্সির গঠনও রোমাঞ্চকর। এটি তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত—কেন্দ্র, ডিস্ক ও হ্যালো। কেন্দ্রে ব্ল্যাক হোলের চারপাশে রয়েছে প্রাচীন তারার ঘন বলয়; ডিস্কে রয়েছে তরুণ তারা, নেবুলা এবং নক্ষত্রের জন্মক্ষেত্র; আর হ্যালোতে ভাসছে ডার্ক ম্যাটার—অদৃশ্য কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণকারী পদার্থ। বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কিওয়ের মোট ভরের প্রায় ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার, যা আলো নিঃসরণ বা প্রতিফলন করে না। এর উপস্থিতি শুধু মাধ্যাকর্ষণ প্রভাবে ধরা পড়ে, অথচ এটিই গ্যালাক্সিকে একত্রে ধরে রাখার প্রধান শক্তি।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, মিল্কিওয়ে স্থির নয়। এটি মহাবিশ্বে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে চলেছে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, গ্যালাক্সিটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬ লক্ষ মাইল বেগে “গ্রেট অ্যাট্রাক্টর” নামে পরিচিত এক রহস্যময় মহাকর্ষীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা জানি না সেখানে কী আছে, কিন্তু তার আকর্ষণে আমাদের পুরো গ্যালাক্সি এগিয়ে চলেছে—যেন মহাবিশ্বের অন্তর্গত এক অদৃশ্য স্রোত আমাদের টেনে নিচ্ছে কোনো অজানা গন্তব্যের দিকে।
আরও একটি কম পরিচিত তথ্য হলো, মিল্কিওয়ের প্রান্তে রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র গ্যালাক্সি—যেগুলো গ্যালাক্সির মাধ্যাকর্ষণে বন্দী হয়ে ধীরে ধীরে এতে মিশে যাচ্ছে। যেমন “স্যাজিটারিয়াস ডোয়ার্ফ গ্যালাক্সি” এবং “ক্যানিস মেজর ডোয়ার্ফ গ্যালাক্সি।” এই সংঘর্ষগুলো মিল্কিওয়েকে ক্রমাগত বড় করে তুলছে, আর একই সঙ্গে তারার জন্মের নতুন সুযোগ তৈরি করছে। অর্থাৎ মিল্কিওয়ে শুধু স্থির এক কাঠামো নয়, বরং এক জীবন্ত মহাজাগতিক সত্তা—যা ধ্বংস ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে টিকে আছে কোটি কোটি বছর ধরে।
সবশেষে বলা যায়, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি কোনো নিছক আলোকরেখা নয়—এটি আমাদের নিজস্ব মহাজাগতিক ঘর। এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। এই গ্যালাক্সির ধূলিকণার মধ্যেই একদিন জন্ম নিয়েছিল সূর্য, পৃথিবী এবং আমরা সবাই। আর যখন আমরা রাতের আকাশে তাকিয়ে সেই দুধসাদা আলোর রেখা দেখি, তখন আসলে আমরা তাকিয়ে থাকি আমাদের নিজেদের উৎপত্তির দিকে—এক মহাজাগতিক গর্ভে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল মানব সভ্যতার প্রথম আলোকযাত্রা।
✳️ সূত্র: নাসা, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA), স্পেস.কম ও সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন

You must be logged in to post a comment.