অশরীরী ছাতা ও ভবঘুরে ভূতের বিড়ম্বনা** 
কলকাতার ফুটপাথে জীবন কাটানো ফটিকচন্দ্র, ওরফে ফটিকদা, ছিলেন এক আশ্চর্য মানুষ। তাঁর ভবঘুরে জীবনের একমাত্র সঙ্গী ছিল একটি মরচে-পড়া ছাতা, যার হাতলটা ভাঙা, আর কাপড়ের জায়গায় জায়গায় অজস্র ছেঁড়া। ফটিকদা এই ছাতাটিকে শুধু রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতেই ব্যবহার করতেন না, তাঁর মতে, এটি নাকি ছিল তাঁর ‘শুভলক্ষণ বহনকারী কবচ’।
একদিন এক বর্ষার রাতে ফটিকদা ধর্মতলার এক দোকানের ছাউনিতে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুমের মধ্যেই তাঁর মনে হলো, ছাতাটা নড়াচড়া করছে! প্রথমে তিনি ভাবলেন, ইঁদুর-টিদুর হবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ছাতাটা তাঁর পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালো, হ্যাঁ, উঠে দাঁড়ালো! যেন অদৃশ্য কেউ সেটাকে ধরে আছে। ফটিকদা চোখ কচলিয়ে দেখলেন, সত্যিই ছাতাটা শূন্যে ভাসছে। তিনি অবাক হয়ে ফিসফিস করে বললেন, “আশ্চর্য! এতদিন শুধু নিজেই ঘুরিয়েছি, এবার ছাতাও ঘুরতে শিখেছে নাকি?”
ঠিক সেই সময়, একটি ভাঙা রেলিংয়ের ওপার থেকে এক ক্ষীণকায়, প্রায় স্বচ্ছ অবয়ব ভেসে এলো। অবয়বটি খুক খুক করে কেশে বলল, “আজ্ঞে মশাই, একটু ধরতে সাহায্য করবেন? ছাতাটা বড় বেয়াড়া, কিছুতেই বাগে আসছে না!”
ফটিকদা ধড়মড় করে উঠে বসলেন। ভূত! এতো স্পষ্ট দিনের আলোর চেয়েও পরিষ্কার ভূত! তবে ভূতটা দেখতে এতটাই বিনম্র আর নিরীহ যে, ফটিকদার ভয় না পেয়ে বরং মায়া হলো।
ফটিকদা বললেন, “আজ্ঞে, আপনি কে মশাই? আর আমার ছাতা নিয়ে কী করছেন?”
ভূতটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমার নাম কেষ্টচন্দ্র। এই শহরেরই এক হতভাগ্য আত্মা। মৃত্যুর পর আমার একমাত্র বাসনা ছিল, একটা সুন্দর ছাতা নিয়ে বর্ষার দুপুরে হাওয়া খেতে বেরোনো। কিন্তু হায়! আমি ছাতাকে ধরতে পারি না! আমার হাত তো আর রক্ত-মাংসের নয়!”
ফটিকদা মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “ওরে বাবা! ছাতা নিয়ে আপনার এত শখ? তা আপনার নিজের ছাতা ছিল না?”
কেষ্টচন্দ্র মুখ ভার করে বলল, “ছিল। কিন্তু সে তো লরির তলায় পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। অশরীরী অবস্থায় তার শোক কাটাতে পারিনি। তাই আপনার ছাতাটা দেখে একটু চেষ্টা করছিলাম…”
ফটিকদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ব্যাপার গুরুতর! মরে গিয়েও আপনার ছাতার মায়া কাটেনি? আর আমার এই ভাঙা ছাতা নিয়ে আপনার এত শখ কেন?”
কেষ্টচন্দ্র লাজুকভাবে বলল, “আজ্ঞে, আপনার এই ছাতার মধ্যেই এক অদ্ভুত শক্তি আছে। মনে হয়, আপনার দীর্ঘদিনের ব্যবহারের ফলে এটি আমার মতো অশরীরীদের কাছে ‘ধরা’ পড়ার মতো একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে।”
ফটিকদা মুচকি হেসে বললেন, “বলেন কী! আমার এই ভাঙা ছাতা এখন ভূত ধরার যন্ত্র হয়ে গেল? শিব্রামের ভাষায় বলতে গেলে, ‘এ তো দেখি ছাতার কপালে রাষ্ট্রপতির সম্মান!’ আর শীর্ষেন্দুর ভাষায়, ‘এ তো বাস্তবের অলৌকিক ছোঁয়া, যা অবাস্তবকে বাস্তব করে তোলে!'”
ফটিকদা ভাবলেন, “এই ভূতটাকে তো আর তাড়িয়ে লাভ নেই। বরং, ওর এই ছাতা-প্রীতিকে কাজে লাগানো যাক।” তিনি কেষ্টচন্দ্রকে বললেন, “দেখুন মশাই, আমি আপনাকে একটা বুদ্ধি দিতে পারি। আপনি আমার এই ছাতা নিয়ে ঘোরাঘুরি করুন, কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
কেষ্টচন্দ্র উৎসুক হয়ে বলল, “কী শর্ত, বলুন!”
ফটিকদা চোখ টিপে বললেন, “আপনি যখন ছাতা নিয়ে ঘুরবেন, তখন যে দোকানে বা বাজারে ঘুরবেন, সেখান থেকে যেন দু-একখানা জিনিস ‘অদৃশ্যভাবে’ আমার জন্য নিয়ে আসতে পারেন। ধরুন, একটা গরম জিলিপি, বা একটা মিষ্টি পানের খিলি… আপনার তো আর টাকা লাগে না, তাই না?”
কেষ্টচন্দ্র অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু সেটা তো চুরি হবে!”
ফটিকদা হো হো করে হেসে উঠলেন। “চুরি? অশরীরীর আবার চুরি কিসের? আর তাছাড়া, কেষ্টচন্দ্র মশাই, আপনি তো ছাতা নিয়ে হাওয়া খাচ্ছিলেন, কেউ আপনাকে দেখেনি। আপনি শুধু হাওয়ার সাথে দু-একখানা জিনিসও নিয়ে এলেন আর কি! এতে দোষের কিছু নেই। আপনার ছাতা-শখও পূরণ হবে, আর আমারও একটু উদরপূর্তি হবে।”
সেই থেকে ফটিকদা আর কেষ্টচন্দ্রের এক অদ্ভুত জুটি তৈরি হলো। ফটিকদার ভাঙা ছাতা নিয়ে অশরীরী কেষ্টচন্দ্র শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরত, আর ফটিকদার জন্য মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব জিনিস এনে দিত – কখনও কারো দোকান থেকে একটা তাজা গোলাপ, কখনও ফুটপাথের চা দোকানের গরম সিঙাড়া, আবার কখনও কারো ফেলে যাওয়া খবরের কাগজ।
ফটিকদা বলতেন, “আহা! ভূত হয়েও মানুষটার কি সাংঘাতিক উপকারের হাত! এইবার মনে হচ্ছে, আমার ছাতা সত্যিই একটা ‘শুভলক্ষণ’ বয়ে আনছে!” আর কেষ্টচন্দ্র মুচকি হেসে অদৃশ্যভাবে তার ছাতা হাতে নিয়ে কলকাতার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াত, বর্ষার দুপুরে নয়, সারা বছরই। কারণ তার ছাতা-শখ পূরণ হচ্ছে, আর ফটিকদার অশরীরী ‘সেবা’ পেয়ে জীবনটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কাটছিল।
You must be logged in to post a comment.