রুমমেট

রুমমেট

রুমমেট

‘বনবাদারে, চিপায় চাপায় অদ্ভুত ঘটনা তো অনেক দেখসোস। হলে উইঠা অদ্ভুত ঘটনা কি একবারও ফেইস করসোস? বল।’
বিকেল বেলা। সারাদিন পৃথিবীর উপর সারা রাগ ঝেড়ে সূর্য মশাই এখন একটু শান্ত হয়েছেন। বিকেলের কমলা রোদে ঘরে ফেরা ক্লান্তির শহরে আমরা বসে চা খাচ্ছিলাম। মিরপুর ডেন্টাল কলেজের মোড়টায়, ওখানে নতুন চায়ের দোকান হয়েছে একটা। সেই চা বানায়।
চা খেতে খেতে ইশরাক ভাই পাড়লেন কথাটা। তিনি মোটামুটি অবিশ্বাসী টাইপ লোক, আমরা অদ্ভুতুড়ে কোনো গল্প শুরু করলে তিনি আঁতেলের মতো থিওরি কপচাতে কপচাতে প্রমাণ করেন পৃথিবীতে অলৌকিক কিছু নাই। তার সামনে ভৌতিক গল্প বলতে বিরক্ত লাগে এজন্য।
আজ তিনি নিজেই অদ্ভুতুড়ে ঘটনার প্রসঙ্গ তুললেন বলে বেশ অবাক হলাম। বললাম, ‘ব্যাপার কি ভাই? কিছু খাওয়া ধরসেন নাকি ইদানিং? এই টাইপের কথা তো আপনার মুখ থেকে বের হওয়ার কথা না।’
ভাই চোখটা লাল টকটকে করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এইজন্যই কিছু বলতে চাই না তোকে। কোনো ব্যাপার সিরিয়াসলি নেস না।’
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একমাস পরেই বিসিএস প্রিলি, বাসায় গিয়ে পড়তে বসতে হবে। বললাম, ‘ভাই রাগ কইরেন না। বলেন কি ব্যাপার স্যাপার। আপনার কথা গুরুত্ব দিয়া শুনি, জানি উল্টাপাল্টা কিছু আপনি বলেন না। এইজন্য অদ্ভুত ঘটনার কথা শুনে একটু অবাক হয়েছিলাম।’
ভাই উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকালেন। ‘অদ্ভুত ঘটনা আসলে কোনোদিনই আমার কাছে শুনতে পাবি না। আমার এসবে বিশ্বাস নাই। তয় ঐদিন কি হইসিলো আমি ঠিক জানি না। হয়তো সত্যি, হয়তো চোখের ভ্রম। আমি ঐসব ঘটনা এখন মনেও করতে চাই না।’
ভৌতিক গল্প শোনার লোভে মনটা লকলক করে উঠলো। বললাম, ‘বলেন ভাই। আপনে যে এই গল্পটা বলসেন, কেউ জানবে না।’
‘তুই তো নাকি গল্প লিখিস ফেসবুকে। এই গল্পটা লিখে দিবি না তো আবার।’
‘না ভাই। বিশ্বাস রাখেন। একটা লাইনও লিখবো না।’
‘ঠিক আছে। বলছি তাইলে শোন।’
‘আমি কোন ভার্সিটিতে পড়সি তুই তো জানোস। ঢাকা ভার্সিটির পরেই মানুষ এই ভার্সিটির নাম নেয়। কপালটা দেখ, সারাজীবন ঢাকায় বড় হইয়া ঢাকাতেই চান্স হইলো না। যাওয়া লাগলো এই ভার্সিটিতে পড়তে।
হলে সিট পাইতে আমাদের দেরি হইসিলো। রাজনৈতিক নেতারা হল দখল করে রাখতো, ওদের পা না চাটলে হলের সিট পাওয়া যাইতো না। পাক্কা দুই বছর পর সিট পাইসিলাম হলে। যেই রুমটায় উঠলাম, আমার খুব পছন্দ হইসিলো রুমটা।‌ হলের দোতলার রুম, জানালা খুললেই ঐপাশে কৃষ্ণচূড়া গাছ। বাতাসে পরাণটা জুড়ায় যায়। এতো মজা হলে থাকতে, হলে না উঠলে আমি বুঝতে পারতাম না।
এখন, যেই রুমটা আমি পাইসি, সেই রুমের একটা বদনাম ছিলো। ঐ রুমে এর আগে দুইটা পোলা সুই*সাইড করসে। একটা ৯৬ এর ব্যাচ, আরেকটা ০৪ এর। এরপর বেশ কিছুদিন রুমটা খালি পড়ে ছিলো, কেউ উঠতে চাইতো না। এরপর আবার সব স্বাভাবিক, রুমে আবার ছেলেপেলে ওঠা শুরু করলো। আর তখন হলের রুমের ক্রাইসিস, কোন রুম ভুতুড়ে কোন রুমে কে মরসে এসব দেখার টাইম কারো নাই, রুমে উঠতে পারলেই হইলো। এইসব ভয়-ভুতুড়ে জিনিসরে কেউ পাত্তাও দিতো না।
আমার সাথে আরো দুই রুমমেট উঠসিলো সেই রুমে। একটা ছিলো আঁতেল, সারাটাদিন পড়তো। আরেকটা ধার্মিক, তাবলীগ করতো, সারাদিন খালি দাওয়াত দিয়ে বেড়াইতো। ওর প্যারায় আমি রুমে না থেকে বাইরে বাইরেই সময় কাটাতাম। এরপরও সে আমার পিছা ছাড়তো না। খালি বলতো ‘ইশরাক, দেখো তোমাকে ধর্মের পথে ঠিকই নিয়া আসবো।’
এর মাঝখানে গ্রীষ্মের ছুটি হয়া গেছে। আমার আঁতেল রুমমেট অলরেডি বাড়ি চলে গেছে, তাবলীগ রুমমেটও বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি ঠিক করেছিলাম আরো দুই তিনদিন পর যাবো, টিউশনি আছে একটা, ঐটা শেষ না কইরা যাইতে পারতেসি না। তাবলীগ রুমমেট যাওয়ার আগে দিয়া বললো, ‘শুনো, এই রুমের একটা বদনাম আছে হলের মধ্যে, আমি প্রতিদিন রাতে দোয়া দরুদ পড়ে ঘুমাতাম, আমাদের এইজন্য খুব একটা সমস্যা হয় নাই। আমি তোমাকে কিছু দোয়া শিখায় যাচ্ছি। ঘুমানোর আগে এইগুলা পড়ে ঘুমাবা। ওপর ওয়ালা চাহেন তো কোনো সমস্যা হবে না।’
আমি মনে মনে বললাম, ‘তুমি নিজের রাস্তা মাপো গিয়া। আমার অতো প্রোটেকশনের দরকার নাই।’
যাই হোক, তাবলীগ বন্ধু সন্ধ্যার মধ্যেই চলে গেলো। হলের অনেক ছেলেপেলেই চলে গেছে, হল প্রায় ফাঁকা। রাতে ক্যান্টিনও বন্ধ, বাইরে হোটেল থেকে খেয়ে আসতে হলো। এই ভাবে ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে হোটেলে গিয়ে খাওয়া একটা প্যারা, ঠিক করলাম কালকে টিউশনিতে গিয়ে আন্টিকে বলে কালকেই বেশি মতো পড়িয়ে ছুটি নিয়ে নিবো। ফাঁকা হলে এইরকম একা একা থাকতে ভালোও লাগে না।
বাইরে থেকে যখন ফিরছি তখন রাত এগারোটার মতো বাজে। ঠিক করেছি বেশি রাত জাগবো না, ঘুমায় যাবো তাড়াতাড়ি। মোবাইলে ঢুকে স্ক্রল করতে করতেই কেমনে জানি সময় চলে গেলো। ঘড়িতে তাকায় দেখি রাত একটা বাজে।
মোটামুটি অন্ধকার হয়ে গেছে চারদিক। আমি রুমের দরজা ভেতর থেকে লাগায় রাখসিলাম আগেই। মোবাইলটা মাথার কাছে রেখে শুয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙলো কিছুক্ষণ পর।
কিসের জানি শব্দ।
প্রথমে বুঝি নাই কিসের শব্দ। আমার সামনে দেয়ালের ওপর জানালাটা খোলা, ঐপাশে কৃষ্ণচূড়ার ফাঁক দিয়ে জোছনার আলো এসে রুমটা ভরে দিয়েছে।
আমি হলের অন্য কোনো রুমের শব্দ ভেবে আবার চোখ বুজলাম। আবার হলো শব্দটা। আমি চোখ বন্ধ করেই কান খাঁড়া করলাম। হঠাৎ করে বুঝলাম, শব্দটা আশেপাশের কোনো রুম থেকে আসে নাই। শব্দটা এসেছে আমার রুম থেকেই। আমার আশপাশের কোনো জায়গা থেকে।
আমি তো ভয় পাইনা কিছুতেই, তুই তো জানিস। অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাস করি নাই কখনো। তখন আরো করতাম না। কিন্তু জানিস, সেদিন কেন যেন মনটা হঠাৎ ছমছম করা শুরু করেছিলো। হঠাৎ করেই মনের মধ্যে এতো ভয় এসে কেমনে জমা হয়েছিলো, আমি জানি না।
অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে‌ শুয়েছিলাম। পাশ ফিরতে সাহস হচ্ছিলো না। কেমন একট গড়গড় শব্দ হচ্ছিলো যেন। মানুষের গলায় ফাঁস লাগলে যেমন একটা গড়গড় শব্দ হয় না, ঠিক তেমনি একটা শব্দ।
শব্দটা অনেকক্ষণ ধরে হচ্ছিলো। ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো আমার। যে জিনিস জীবনে করি নাই, সেই জিনিসটাই সেদিন করলাম। ওপরওয়ালাকে ডাকতে লাগলাম। হে পরোয়ার দিগার, আমাকে এই বিপদ থেকে তুমি রক্ষা করো। আর কখনো তোমার অবাধ্য হবো না।
শব্দটা হঠাৎ থেমে গেলো। আর কোনো শব্দ নাই চারদিকে। শুধু নিঃস্তব্ধ রাতে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকার শব্দ।
আমি হাঁপ ছাড়লাম। বাঁচছি। আর কোনো বিপদ নাই।
এরপর ঘুরে পাশ ফিরে শুতে গেলাম। তখন, তখনই দেখলাম ব্যাপারটা।’
ইশরাক ভাইয়ের মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। আমি তখন কৌতুহল ফেটে পড়ছি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি, কি দেখলেন ভাই?’
‘না, দেখি নাই কিছু। আমার দৃষ্টিভ্রম হয়েছিলো, ভয়ে নার্ভ কাজ করছিলো না। সেইজন্য উল্টাপাল্টা দেখসি।’
‘কি দেখসেন, বলেন না ভাই।’
ইশরাক ভাই আমার দিকে তাকালেন। ‘তোকে বলসিলাম না, রুমে কেবল আমি একাই ছিলাম। রুমমেট দুজনেই গেছিলো ছুটিতে।’
‘হ্যাঁ।’
‘ভুল বলসিলাম।’
‘মানে?’
‘একা ছিলাম না রুমে।’
‘মানে?’
ইশরাক ভাই চোখে ভয় আর আতংক নিয়ে, কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘আমার পাশের বেডের ওপর একজন বসে ছিলো। চোখ বড় বড় করে, একবারও পলক না ফেলে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে।’
‘কি? কি বলেন? কে ছিলো?’
‘হাসতেছিলো আমার দিকে তাকায়। এমন ভয়ানক হাসি আমি দেখি নাই কখনো আর।’
‘কে? কে ছিলো ভাই ওটা।’
ইশরাক ভাই দাঁড়ায় পড়লেন। ‘কেউ ছিলো না। এইসব নিয়া আমি আর কথা বলবো না কখনো। তুইও কিছু জিজ্ঞেস করবি না। চায়ের বিলটা আমি দিয়ে দিবো পরে। তুই বাসায় যা।’
ভাই আর একমিনিটও দাঁড়ালেন না। হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন। আমি খালি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার যদি সুযোগ হতো, তাইলে ইশরাক ভাইকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করতাম কাকে তিনি দেখেছিলেন সে রাতে? কে ছিলো তার পাশের বেডের ওপর? কিন্তু সেই সুযোগটা আমি আর পাই না। ইশরাক ভাইয়ের সাথে আর দেখা হয় নাই আমার।
ইশরাক ভাই সে রাতেই সুই*সাইড করেছিলেন। একা ছিলেন বাসায়। কেন তিনি এমন একটা কাজ করেছিলেন, তা আমরা আজও কেউ জানি না।
(শেষ)
গল্প- রুমমেট
সোয়েব বাশার

You must be logged in to post a comment.